টানা বৃষ্টিতে রাত-সকাল আর দুপুরের আকাশ এক রংয়ের হয়ে গেলো । ধূসর কালো
আকাশের ঠাণ্ডা দুপুরে ইমেল নোটিফিকেশনের টুংটাং একটা সাউন্ড আস্তে করে মিশে
গেলো বৃষ্টির শব্দে ।
আবিদ খুব মনোযোগের সাথে জারিফের পা ধরে রেখেছে । বুকের মাঝখানটায় পা দুটো ধরে ফর্সা পায়ের তলায় তাকিয়ে থাকে , প্রবল ভালবাসা নিয়ে সেখানে আঙ্গুল ঘুরাতে ঘুরাতে বললো , 'ওই পুলা , ওই । বল্ তো , তোকে যে পুলা ডাকি , পুলা মানে কি ? '
জারিফ তার প্রশ্ন শুনেছে বলে মনে হয়না , শুনলেও বুঝতে পারার কোন লক্ষণ দেখা গেলো না । মোবাইল থেকে চোখ না সরিয়ে দুর্বোধ্য কিছু শব্দ বললো --- এ্যাঁ পুতাকা পুতাকা ! বেইবি , আমাকে কেভিন ,স্টুয়ার্ট, বব এনে দিবা । এ্যাঁ পুতাকা পুতাকা ! ' তারপর আবার ব্যস্ত হয়ে পড়লো । আবিদের ঠোঁট থেকে একটা হাসি সমস্ত মুখে ছড়িয়ে যায় । নিজের বাচ্চাটাকে গল্পে গল্পে শিক্ষা দেওয়ার প্ল্যান এমন করুণ, অথচ হাস্যকর ভাবে ব্যর্থ হলেও তার সুখ সুখ লাগলো । বোতসোয়ানার ভাষায় পুলা মানে বৃষ্টি ---- এই ব্যাপারটা এমন দশদিক ভাসিয়ে দেওয়া বৃষ্টির দিনে পুঁচকে টাকে শিখাতে পারলে হয়তো সারাজীবন মনে রাখতো । কিন্তু শেখাতে না পেরেও বাইরের বৃষ্টির ঝমঝমানির মতন আনন্দ তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে । আরও ভালবাসা নিয়ে সে জারিফের পা দুটো ধরলো । ছোট ছোট আঙ্গুল , তার চেয়েও ছোট ছোট নখ নিয়ে কি সুন্দর মসৃণ এক-একটা পা । পায়ের তলায় সুড়সুড়ি দিয়ে আবিদ নিজেই খানিকটা হাসলো , বললো , 'এ্যাই পুলা , মাছ বৃষ্টির গল্প শুনবি ? '
মাছ বৃষ্টির গল্প নিয়েও জারিফের মাঝে কোন আকর্ষণ দেখা গেলো না । সুড়সুড়ি পেয়ে চিৎ হয়ে দুটো মোচড় দিলো , সুন্দর একটা হাসিতে চারপাশ আলোড়িত করে ' পোবেরু পোবেরু ' বলে আবিদের দিকে জিজ্ঞাসু - রাগী চোখে তাকালো , তারপর আবার মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলো ।
পিতা পুত্রের এমন অসম প্রেম - জ্ঞান - ভালবাসা - ভাণ - ব্যস্ততা হয়তো আরও কিছুক্ষণ চলতে পারতো ----মাঝখানে ইরা না আসলে ; আবিদ আরও কিছুক্ষণ হয়তো জ্বালাতো জারিফকে । কিন্তু দরজার ওপাশে ইরা একহাতে মাথার চুল, আরেক হাতে দরজার পর্দা সরাতে সরাতে এসে দাঁড়ালো । ইরার উপস্থিতি টের পেয়ে আবিদ একবার তাকালো শুধু , কিছু না বলে উঠে বসলো , লুঙ্গি ঠিক করতে করতে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলো । ইরাও তার দিকে বিশেষ ভ্রূক্ষেপ করলো না । দুদিন ধরে তাদের মধ্যে ঠাণ্ডা একটা মান - অভিমান পর্ব চলছে এবং এটা নিয়ে ইরার বিশেষ মাথাব্যথা নেই । সে চাইছে ঝগড়া চলতে থাকুক কয়েকদিন । সম্পর্কের মাঝে মাঝে ঝগড়া না হলে ---- অসমাপ্ত ভাবনা একপাশে সরিয়ে রেখে সে জারিফকে ডাকতে লাগলো । আবিদও সেদিকে কোন কান দিলো না । লুঙ্গি ঠিক করতে করতে শরীরটাকে একবার টানা দিলো । বেশ কয়েকটা আঙ্গুল ফুটানোর মত শব্দ হলো । তারপর হাই তুলতে তুলতে বসে পড়লো চেয়ারের উপর । . মেইলের নোটিফিকেশন দেখেও তার মধ্যে কোন ভাবান্তর হলো না । আজকাল বেশ অদ্ভুত আর উদ্ভট মেইল আসছে । কয়েকবছর আগেও সে মেইলের জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করতো , সেই মেইল আজকাল দেখলে ভয় পায় ।
সেদিন কে যেন মেইল করলো --- "Hi . This is Kate and 19. I really find you handsome and love to have sexet..." মেইল পড়ে আবিদ হকচকিত ! এই স্প্যামার মেয়ে আবিদকে দেখলোই কোথায় আর হ্যান্ডসামই বা পেলো কোথায় ! আজকের মেইল নিয়েও তার কোন ইন্টারেস্ট কাজ করলো না । তবু চিঠির একটা চিরকালীন আবেদন আছে । সামনে একটা নতুন চিঠি পড়ে আছে , অথচ সেটা পড়া হয়নি ---- এমন অবস্থায় কৌতূহল আর উত্তেজনায় উশখুশ লাগবেই --- সেটা যার লেখা চিঠিই হোক না কেন ; কাগজের চিঠি বা ভার্চুয়াল চিঠি যাই হোক । সেই চিরাচরিত আগ্রহ আর অভ্যাস বশত অনিচ্ছা নিয়ে মেইলে ক্লিক করলো । মেইল খুললেও আবিদ সেদিকে তাকালো না । তাকালে হয়তো তার মুখটা অন্যরকম হয়ে যেতো । কম্পিউটারের একঘেয়ে স্ক্রীন ছাপিয়ে জানালা ধরে বাইরে তাকিয়ে রইলো । ভেজা বাতাসের ভারে নারকেল গাছগুলো কেঁপে কেঁপে উঠছে । বিরতিহীন ছলছল বৃষ্টিতে গাছের নুয়ে পড়া দেখলে মনে হয় , আদিম পৃথিবীর কিছুই বদলায়নি । সেই আদম - হাওয়ার আদিমতার মতন আজকের আকাশ ফাটিয়ে আসা বৃষ্টিও আদিম । এই প্রাচীনতার কোন পার্থক্য নেই । কোন বদলও নেই । আকাশজুড়ে শ্রাবণের জয়ধ্বজা --- মেঘ, আর বজ্রবীণার গুড় - গুড় ধুরুম - ধুরুম শব্দে চোখ কান অলস হয়না , শুধু মন কেমন কেমন করে । অক্লান্ত চোখে নিমেষের জন্য স্ক্রীনে চোখ রাখে সে ---- শেষের দিকের দুয়েক শব্দতেই চোখ আটকে যায় ।
নিরীহ কয়েকটা অক্ষরে লেখা " তোমার বৃষ্টিদেবতা... ইন্দ্র " । তিনটে মাত্র শব্দ । তাও তার প্রশ্বাস বাড়িয়ে দেয় , এতক্ষণের সুখ সুখ প্রশান্ত ভাব মুছে যায় ; মনে হয় : বুকের উপর কেউ চেপে বসে আছে , থেকে থেকে ক্রমাগত দমবন্ধ করে দিতে চাইছে । কোন ইচ্ছা ছাড়াই মেইলটা কখন একবার পড়া হয়ে গেলো টের পেলো না । দ্বিতীয়বার পড়ার আর সাহস হয়নি । ইচ্ছাও হয়নি । বুকের দ্রুত উঠানামার সাথে সাথে তার কেবল মনে হচ্ছিল , অনির্দিষ্ট একটা জগত থেকে তার আবার ডাক আসছে । বড় কঠিন সেই আহ্বান । নিষ্ঠুর অমোঘ সেই আকর্ষণ । স্ক্রীন বন্ধ করে লম্বা দম নিতে লাগলো ---- অনেকটা সময় পানিতে ডুবে থাকার পর বাতাস পেলে মানুষ যেমন হা করে দম নেয় । ইরা তখনো জারিফকে কি যেন বুঝিয়ে বলছে । প্রবল একটা ভয়ে আবিদের সমস্ত চেতনা উলটপালট হতে লাগলো। মেইলটাতে একবার মাত্র চোখ বুলিয়েছে । মনে থাকার কথা না , তবু মনের ইচ্ছার বিপরীতে প্রথম লাইনটা বারবার চোখের সামনে চলে আসছে । সম্বোধনহীন সেই লাইনে লেখা ---- কোন একটা জুলাই মাসের ২৯ তারিখ তো আমাদের ওয়াইনেসবার্গ থাকার কথা ছিল , তাইনা ? প্রথম লাইনটার অর্থ কি , কেন ওয়াইনেসবার্গ থাকার কথা ছিল , তা আবিদ জানে ; কিন্তু অস্বীকার করতে চাইছে । যেন এবিষয়ে সে কিছুই জানেনা , কখনও জানেও নি । কিন্তু মানুষের মনের বিশেষ একটা বৈশিষ্ট্য হল "না" করা নিষিদ্ধ ব্যাপারেই তার আকর্ষণ বেশি । তাই মস্তিষ্কের একটা অংশ বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে --- ওয়াইনেসবার্গে গত একশ বছর ধরে জুলাইয়ের ২৯ তারিখ বৃষ্টি হওয়ার যে ঐতিহ্য : সেই শতবর্ষের ওয়ানেইসবার্গ বৃষ্টিকে স্বাগত জানানোর কথা ছিল তাদের । তাদের ? সে আর সেই মানুষ...সেই মানুষ যাকে ভুলতে গিয়েও ভুলে থাকার চেষ্টা ব্যর্থতর থেকে ব্যর্থতম হচ্ছে ।
চোখ বন্ধ করে একশ থেকে উল্টো করে গুণতে গুণতে আবিদ সামনে এগুলো , কাছে গিয়ে শক্ত করে ইরার হাত ধরে সাথে আসার ইঙ্গিত দিলো , তারপর দরজার ওপাশে নিয়ে গেলো । ইরার হতভম্ব ভাব তখনো কাটেনি । কানের পাশে লালার গরম উত্তাপের তাপে তার হতভম্ব ভাব কেটে খানিকটা অভিমানের ছায়া পড়লো , সাথে সাথে সেটা লজ্জায় পরিণত হলো ।
মৃদু ধাক্কায় নিজেকে সরিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, "যাঃ ! চা খাবে ? " বলেই সরে গেলো । সরে যাওয়ার আগে লজ্জামাখা চাপা একটা হাসি দিয়ে গেলো , অভিজ্ঞ চোখ মাত্রই সেই হাসির অর্থ বুঝবে, চাপা ভৎর্সনা দিয়ে ইরা বুঝাতে চাইছে ---- আমি খুশি হয়েছি ! কিন্তু তুমি কি করছো , বোকা ! পাশের ঘরে জারিফ শুয়ে আছেনা ! পর্দার ঠিক ওপাশেই জারিফ তখনো মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত । আবিদ যদি স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতো , তাহলে নিজের কাছেই এমন কাজ বেখাপ্পা মনে হতো । বিয়ের প্রথম প্রথম এমন দমকা - ঝটকা - হঠকারী রোমান্সে সমস্যা নেই --- হয়তো প্রয়োজনীয়ই ; কিন্তু এতগুলো বছর পর , পাশাপাশি নিজের বাচ্চা ছেলেকে রেখে এমন ঝটিতি চুমু খানিকটা না , বেশ বোকামো আর বেমানান । কিন্তু আবিদের তখন অতশত ভাবার মত অবস্থা নেই ।
আবিদ খুব মনোযোগের সাথে জারিফের পা ধরে রেখেছে । বুকের মাঝখানটায় পা দুটো ধরে ফর্সা পায়ের তলায় তাকিয়ে থাকে , প্রবল ভালবাসা নিয়ে সেখানে আঙ্গুল ঘুরাতে ঘুরাতে বললো , 'ওই পুলা , ওই । বল্ তো , তোকে যে পুলা ডাকি , পুলা মানে কি ? '
জারিফ তার প্রশ্ন শুনেছে বলে মনে হয়না , শুনলেও বুঝতে পারার কোন লক্ষণ দেখা গেলো না । মোবাইল থেকে চোখ না সরিয়ে দুর্বোধ্য কিছু শব্দ বললো --- এ্যাঁ পুতাকা পুতাকা ! বেইবি , আমাকে কেভিন ,স্টুয়ার্ট, বব এনে দিবা । এ্যাঁ পুতাকা পুতাকা ! ' তারপর আবার ব্যস্ত হয়ে পড়লো । আবিদের ঠোঁট থেকে একটা হাসি সমস্ত মুখে ছড়িয়ে যায় । নিজের বাচ্চাটাকে গল্পে গল্পে শিক্ষা দেওয়ার প্ল্যান এমন করুণ, অথচ হাস্যকর ভাবে ব্যর্থ হলেও তার সুখ সুখ লাগলো । বোতসোয়ানার ভাষায় পুলা মানে বৃষ্টি ---- এই ব্যাপারটা এমন দশদিক ভাসিয়ে দেওয়া বৃষ্টির দিনে পুঁচকে টাকে শিখাতে পারলে হয়তো সারাজীবন মনে রাখতো । কিন্তু শেখাতে না পেরেও বাইরের বৃষ্টির ঝমঝমানির মতন আনন্দ তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে । আরও ভালবাসা নিয়ে সে জারিফের পা দুটো ধরলো । ছোট ছোট আঙ্গুল , তার চেয়েও ছোট ছোট নখ নিয়ে কি সুন্দর মসৃণ এক-একটা পা । পায়ের তলায় সুড়সুড়ি দিয়ে আবিদ নিজেই খানিকটা হাসলো , বললো , 'এ্যাই পুলা , মাছ বৃষ্টির গল্প শুনবি ? '
মাছ বৃষ্টির গল্প নিয়েও জারিফের মাঝে কোন আকর্ষণ দেখা গেলো না । সুড়সুড়ি পেয়ে চিৎ হয়ে দুটো মোচড় দিলো , সুন্দর একটা হাসিতে চারপাশ আলোড়িত করে ' পোবেরু পোবেরু ' বলে আবিদের দিকে জিজ্ঞাসু - রাগী চোখে তাকালো , তারপর আবার মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলো ।
পিতা পুত্রের এমন অসম প্রেম - জ্ঞান - ভালবাসা - ভাণ - ব্যস্ততা হয়তো আরও কিছুক্ষণ চলতে পারতো ----মাঝখানে ইরা না আসলে ; আবিদ আরও কিছুক্ষণ হয়তো জ্বালাতো জারিফকে । কিন্তু দরজার ওপাশে ইরা একহাতে মাথার চুল, আরেক হাতে দরজার পর্দা সরাতে সরাতে এসে দাঁড়ালো । ইরার উপস্থিতি টের পেয়ে আবিদ একবার তাকালো শুধু , কিছু না বলে উঠে বসলো , লুঙ্গি ঠিক করতে করতে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলো । ইরাও তার দিকে বিশেষ ভ্রূক্ষেপ করলো না । দুদিন ধরে তাদের মধ্যে ঠাণ্ডা একটা মান - অভিমান পর্ব চলছে এবং এটা নিয়ে ইরার বিশেষ মাথাব্যথা নেই । সে চাইছে ঝগড়া চলতে থাকুক কয়েকদিন । সম্পর্কের মাঝে মাঝে ঝগড়া না হলে ---- অসমাপ্ত ভাবনা একপাশে সরিয়ে রেখে সে জারিফকে ডাকতে লাগলো । আবিদও সেদিকে কোন কান দিলো না । লুঙ্গি ঠিক করতে করতে শরীরটাকে একবার টানা দিলো । বেশ কয়েকটা আঙ্গুল ফুটানোর মত শব্দ হলো । তারপর হাই তুলতে তুলতে বসে পড়লো চেয়ারের উপর । . মেইলের নোটিফিকেশন দেখেও তার মধ্যে কোন ভাবান্তর হলো না । আজকাল বেশ অদ্ভুত আর উদ্ভট মেইল আসছে । কয়েকবছর আগেও সে মেইলের জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করতো , সেই মেইল আজকাল দেখলে ভয় পায় ।
সেদিন কে যেন মেইল করলো --- "Hi . This is Kate and 19. I really find you handsome and love to have sexet..." মেইল পড়ে আবিদ হকচকিত ! এই স্প্যামার মেয়ে আবিদকে দেখলোই কোথায় আর হ্যান্ডসামই বা পেলো কোথায় ! আজকের মেইল নিয়েও তার কোন ইন্টারেস্ট কাজ করলো না । তবু চিঠির একটা চিরকালীন আবেদন আছে । সামনে একটা নতুন চিঠি পড়ে আছে , অথচ সেটা পড়া হয়নি ---- এমন অবস্থায় কৌতূহল আর উত্তেজনায় উশখুশ লাগবেই --- সেটা যার লেখা চিঠিই হোক না কেন ; কাগজের চিঠি বা ভার্চুয়াল চিঠি যাই হোক । সেই চিরাচরিত আগ্রহ আর অভ্যাস বশত অনিচ্ছা নিয়ে মেইলে ক্লিক করলো । মেইল খুললেও আবিদ সেদিকে তাকালো না । তাকালে হয়তো তার মুখটা অন্যরকম হয়ে যেতো । কম্পিউটারের একঘেয়ে স্ক্রীন ছাপিয়ে জানালা ধরে বাইরে তাকিয়ে রইলো । ভেজা বাতাসের ভারে নারকেল গাছগুলো কেঁপে কেঁপে উঠছে । বিরতিহীন ছলছল বৃষ্টিতে গাছের নুয়ে পড়া দেখলে মনে হয় , আদিম পৃথিবীর কিছুই বদলায়নি । সেই আদম - হাওয়ার আদিমতার মতন আজকের আকাশ ফাটিয়ে আসা বৃষ্টিও আদিম । এই প্রাচীনতার কোন পার্থক্য নেই । কোন বদলও নেই । আকাশজুড়ে শ্রাবণের জয়ধ্বজা --- মেঘ, আর বজ্রবীণার গুড় - গুড় ধুরুম - ধুরুম শব্দে চোখ কান অলস হয়না , শুধু মন কেমন কেমন করে । অক্লান্ত চোখে নিমেষের জন্য স্ক্রীনে চোখ রাখে সে ---- শেষের দিকের দুয়েক শব্দতেই চোখ আটকে যায় ।
নিরীহ কয়েকটা অক্ষরে লেখা " তোমার বৃষ্টিদেবতা... ইন্দ্র " । তিনটে মাত্র শব্দ । তাও তার প্রশ্বাস বাড়িয়ে দেয় , এতক্ষণের সুখ সুখ প্রশান্ত ভাব মুছে যায় ; মনে হয় : বুকের উপর কেউ চেপে বসে আছে , থেকে থেকে ক্রমাগত দমবন্ধ করে দিতে চাইছে । কোন ইচ্ছা ছাড়াই মেইলটা কখন একবার পড়া হয়ে গেলো টের পেলো না । দ্বিতীয়বার পড়ার আর সাহস হয়নি । ইচ্ছাও হয়নি । বুকের দ্রুত উঠানামার সাথে সাথে তার কেবল মনে হচ্ছিল , অনির্দিষ্ট একটা জগত থেকে তার আবার ডাক আসছে । বড় কঠিন সেই আহ্বান । নিষ্ঠুর অমোঘ সেই আকর্ষণ । স্ক্রীন বন্ধ করে লম্বা দম নিতে লাগলো ---- অনেকটা সময় পানিতে ডুবে থাকার পর বাতাস পেলে মানুষ যেমন হা করে দম নেয় । ইরা তখনো জারিফকে কি যেন বুঝিয়ে বলছে । প্রবল একটা ভয়ে আবিদের সমস্ত চেতনা উলটপালট হতে লাগলো। মেইলটাতে একবার মাত্র চোখ বুলিয়েছে । মনে থাকার কথা না , তবু মনের ইচ্ছার বিপরীতে প্রথম লাইনটা বারবার চোখের সামনে চলে আসছে । সম্বোধনহীন সেই লাইনে লেখা ---- কোন একটা জুলাই মাসের ২৯ তারিখ তো আমাদের ওয়াইনেসবার্গ থাকার কথা ছিল , তাইনা ? প্রথম লাইনটার অর্থ কি , কেন ওয়াইনেসবার্গ থাকার কথা ছিল , তা আবিদ জানে ; কিন্তু অস্বীকার করতে চাইছে । যেন এবিষয়ে সে কিছুই জানেনা , কখনও জানেও নি । কিন্তু মানুষের মনের বিশেষ একটা বৈশিষ্ট্য হল "না" করা নিষিদ্ধ ব্যাপারেই তার আকর্ষণ বেশি । তাই মস্তিষ্কের একটা অংশ বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে --- ওয়াইনেসবার্গে গত একশ বছর ধরে জুলাইয়ের ২৯ তারিখ বৃষ্টি হওয়ার যে ঐতিহ্য : সেই শতবর্ষের ওয়ানেইসবার্গ বৃষ্টিকে স্বাগত জানানোর কথা ছিল তাদের । তাদের ? সে আর সেই মানুষ...সেই মানুষ যাকে ভুলতে গিয়েও ভুলে থাকার চেষ্টা ব্যর্থতর থেকে ব্যর্থতম হচ্ছে ।
চোখ বন্ধ করে একশ থেকে উল্টো করে গুণতে গুণতে আবিদ সামনে এগুলো , কাছে গিয়ে শক্ত করে ইরার হাত ধরে সাথে আসার ইঙ্গিত দিলো , তারপর দরজার ওপাশে নিয়ে গেলো । ইরার হতভম্ব ভাব তখনো কাটেনি । কানের পাশে লালার গরম উত্তাপের তাপে তার হতভম্ব ভাব কেটে খানিকটা অভিমানের ছায়া পড়লো , সাথে সাথে সেটা লজ্জায় পরিণত হলো ।
মৃদু ধাক্কায় নিজেকে সরিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, "যাঃ ! চা খাবে ? " বলেই সরে গেলো । সরে যাওয়ার আগে লজ্জামাখা চাপা একটা হাসি দিয়ে গেলো , অভিজ্ঞ চোখ মাত্রই সেই হাসির অর্থ বুঝবে, চাপা ভৎর্সনা দিয়ে ইরা বুঝাতে চাইছে ---- আমি খুশি হয়েছি ! কিন্তু তুমি কি করছো , বোকা ! পাশের ঘরে জারিফ শুয়ে আছেনা ! পর্দার ঠিক ওপাশেই জারিফ তখনো মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত । আবিদ যদি স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতো , তাহলে নিজের কাছেই এমন কাজ বেখাপ্পা মনে হতো । বিয়ের প্রথম প্রথম এমন দমকা - ঝটকা - হঠকারী রোমান্সে সমস্যা নেই --- হয়তো প্রয়োজনীয়ই ; কিন্তু এতগুলো বছর পর , পাশাপাশি নিজের বাচ্চা ছেলেকে রেখে এমন ঝটিতি চুমু খানিকটা না , বেশ বোকামো আর বেমানান । কিন্তু আবিদের তখন অতশত ভাবার মত অবস্থা নেই ।
তার মাথায় তখন সম্বোধনহীন চিঠির লাইন ঘুরপাক খাচ্ছে ---- "... কতদিন আমাদের মাঝে বৃষ্টি হয়না । ভাবছি ভালবেসে এবার বৃষ্টি নামাবো । আমাদের শরীরের ভাঁজ থেকে ভাঁজে , কামনার উত্তাপে বরফ গলাবো , তারপর নগ্ননৃত্য করবো উণ্মাদ উদ্দাম । বিপিন পার্কের সেই কদম গাছটার কথা মনে আছে ? বৃষ্টির সময় কেমন বুনো গন্ধে চারপাশ ভরিয়ে দিতো । আমাদের এবারকার বৃষ্টিতে সেই কদম গাছটা থাকবেনা , তবেঁ তোমার বুনো গন্ধ লেপ্টে থাকবে আমার ঘ্রাণ । দুজনে মাতোয়ারা হব সেই ঘ্রাণের বৃষ্টিতে । এন্টার্কটিকায় যতটুকু বৃষ্টি হয় , সেই ছয় ইঞ্চি পরিমাণ বৃষ্টির মাদকতায় আমরা কতদিন ভাসিনা । হুম ? "
এন্টার্কটিকায় ছয় ইঞ্চি বৃষ্টি' ইঙ্গিতটার মধ্যে যে অশ্লীলতাটুকু আছে , তাতেই বারবার তলিয়ে যাচ্ছে আবিদ । সে জানে , সে তলিয়ে যাচ্ছে । সে জানে এক নোংরা কাদার পাঁকে সে জড়িয়ে যাচ্ছে । কিন্তু কেউ তাকে উদ্ধার করছে না কেন ? কই , ইরাও তো চেষ্টা করছে না ! সে যখন ইরার কান কামড়িয়ে মনে মনে প্রার্থনা করছিল --- "আমাকেও কামড়ে দাও ইরাবতী ! " তখন কেন ইরা তাকে কামড়ে দিলোনা ? কেন কখনওই তাকে কামড়িয়ে আছড়িয়ে ইরা শেষ করে দেয়না , যা সেই বিশ্বাসঘাতক সন্ন্যাসী জাকির অনায়াসে করতে পারতো ? আবিদের কেন যেন ক্ষতবিক্ষত হওয়ার অভাব বোধ হতে থাকে । মনে হয় , হাজার বছরের উপোসী বিধবাদের মত ক্ষুধাতুর হয়ে আছে তার শরীর । কানের কাছে তীব্র কুটুস করে চুমুর অভাবে তার মাথা গুলাতে থাকে ।
**
জাকিরের সাথে তার শেষ দেখা জাকিরের মায়ের মৃত্যুর দিন । মৃত বাড়ির আলাদা একটা পরিচয় থাকে । গোলাপজল- আগরবাতির গন্ধে আশপাশের বাতাস ভুরভুর করছে । হুটহাট সব দরজা খোলা । অনেক মানুষ । আসছে - যাচ্ছে । কিন্তু সবার মুখে বিষণ্ণতার মুখোশ দেওয়া ; কেউ হয়তো সত্যিকারের বিষণ্ণ । কেউ কাউকে দেখলেও পরিচিত সম্ভাষণের হাসি দিচ্ছে না , কাউকে গিয়ে ভদ্রতা করে কিছু জিজ্ঞেসও করা যাচ্ছে না । আসাদের ফোন পেয়ে অফিস থেকে সোজা চলে এসেছে আবিদ । আজ এমনিতেও বিকেলবেলা আসতো মা'কে দেখার জন্য । তার আগেই সকালবেলা আসাদ জানালো খোদেজা বেগম চলে গেছেন । দিনের শুরুতে স্পষ্ট করে কথা বলতে লাগলেন অনেকদিন পর । শেষ কয়েকদিন কথাই বলতে পারেননি । প্রদীপ নেভার আগে দপ্ করে জ্বলে ওঠলো , নিভেও গেল কিছুক্ষণ পর । সেই সামান্য আলো হয়তো কিছুই দিতে পারেনি , কিন্তু পুড়িয়ে গেলো হয়তো অনেককিছু । মরার আগে জবান খুলেছিল বোধহয় শেষ আফসোসটুকু করতে । জাকিরের দিকে তাকিয়ে তিনি বলছিলেন , " জাকির রে , নাতি দেখতে পারলাম না । একটা বউও দেখাইলি না । বাপরে , বিয়া কইরা সুখী হইস । বংশের বাতি নিভাইস না বাবা । " ফোন পেয়ে সাথে সাথেই রওয়ানা দিয়েছিল , কিন্তু আবিদ আসতে আসতে সারাবাড়ি ততক্ষণে "মৃত" বাড়ি হয়ে গেছে । চারপাশে অপরিচিত মানুষের ভীড়ে কয়েকজন হয়তো পরিচিতই ছিল --- জাকিরের বন্ধু হিসেবে । কিন্তু কা'কে কি বলতে হবে , কেমন করে জিজ্ঞেস করতে হবে এই নিয়ে তার দিশাহারা অবস্থা । ইতিউতি করে আশেপাশে তাকিয়ে যখন সে প্রায় নিরাশ , তখন পেছন থেকে আসাদ কাঁধে হাত রাখলো , ঘুরে তাকাতেই আসাদ বোকার মত জিজ্ঞেস করলো , "কি অবস্থা ভাই ? " ভদ্রতার একটা হাসি দিতে গিয়েও থামিয়ে নিলো , কী করা উচিত বুঝতে না পেরে আবিদের অস্বস্তির সীমা রইলো না । আসাদও কেমন বোকার মত জিজ্ঞেস করে ফেলেছে । আবিদ শুধু কাঁধ ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলো , "জাকির কোথায়? " জাকিরকে ঠিক কী বলা উচিত ---- কেমন করে তার কাঁধে হাত রাখা উচিত নাকি সবার সামনে বুকে টেনে নিয়ে বুঝানো উচিত 'আমি আছি , আমি তোমার পাশে আছি ' ? সেসব নিয়ে অনেক দ্বিধা ছিল , কিন্তু জাকিরই সেসব দ্বিধা থেকে মুক্তি দিয়েছিল । ঘরে ঢুকে দেখা গেলো সে চুপচাপ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে । ঘরে আর কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি । পাশের ঘর থেকে মহিলাদের উচ্চস্বরে বিলাপ ভেসে আসছে , তারচেয়েও জোরে ভেসে আসছে কোরান খতম দেওয়ার সুর । জাকিরের মুখ জুড়ে ক্লান্তি , রক্তশূন্য মুখে সাদা ফ্যাকাশে ঠোঁট ।
আসাদকে দেখে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো , বললো , "মাইকিং এর ব্যবস্থা করেছিস ? " প্রয়োজনের চেয়েও অস্বাভাবিক রকম রূক্ষ, ঠাণ্ডা আর গমগমে শোনাল তার গলা , শোকের চিহ্নমাত্র নেই । আবিদের দিকে সে তাকায়ও নি , মনে হয়েছিল আসাদের পাশে আর কেউ দাঁড়িয়ে নেই । ধীরে ধীরে অস্বস্তি কাটিয়ে যখন আবিদ জাকিরের কাঁধে হাত রেখে পেছন থেকে কাঁধ রেখে মাথা হেলিয়ে দিয়েছিল , তখন জাকির শুধু মুটি শক্ত করে তার হাত ধরেছিল । আর কোন কথা হয়নি । সেদিনের উপেক্ষা হয়তো শোকের কারণে অস্বাভাবিক লাগেনি ; কিন্তু জাকির সেই উপেক্ষাকেই অভ্যাসে পরিণত করলো ---- সারাজীবনের জন্য । তিনদিন , চারদিন । শোক । দশদিন , বিশদিন । শোক । শোক । শোক । যোগাযোগের সব চেষ্টা ব্যর্থ । চেষ্টা করতে করতে আবিদ ততদিনে হাঁপিয়ে উঠেছে । অপেক্ষা । প্রতীক্ষা । সারারাত জেগে জেগে সবগুলো নাম্বারে চেষ্টা করা --- এই এখন হয়তো মোবাইল খুলেছে । আর সারাদিন অফিস বাদ দিয়ে , ছুটি নিয়ে , জাকিরের বাসায় গিয়ে বন্ধ দরজার সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকা আর নিষ্ফল অনুনয় । দিন যেতে যেতে মাস হয় । অপেক্ষা একসময় রাগ , রাগ থেকে ভয় , তারপর আবেগহীন একপ্রকার ক্রোধ জন্ম নেয় আবিদের মাঝে । চল্লিশতম দিনে জাকিরের হয়তো খানিকটা দয়া হয়েছিল । ততদিনে বাসায় যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে আবিদ , নাম্বারও বদলে নিয়েছে । যোগাযোগের দৃশ্যত কোন উপায় ছিল না । তবু অফিসের মেইল চেক করে গিয়ে জাকিরের "দয়া " তার চোখে পড়লো । জীবন থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করা সেই মেইল অনেকবার পড়েছে আবিদ । অনেক অনেক বার । পড়তে পড়তে মুখস্থ করেছে , প্রিন্ট করে প্রতিটা শব্দ কেটেছে , তবু জ্বালা মিটেনি । মৃত মায়ের আত্মাকে আর কষ্ট দিতে চায়না জাকির । তাই সে বিয়ে করে সংসারী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে । জাকিরকে যে "কবর বৈরাগ্য " পেয়েছিল , সেটা ঠিকই বুঝেছিল আবিদ । ভেবেছিল , কয়েকদিন পর হয়তো ঠিকও হয়ে যাবে । কোন শোকই চিরস্থায়ী নয় । জাকিরও সামলে উঠেছিল । তবে সেটা আবিদের জন্য নয় , অন্যকেউ । চল্লিশটা দিন পার করে একচল্লিশতম দিনে মায়ের ইচ্ছা পূরণ করেছিল । কোন না কোন মেয়েকে বিয়ে করে হানিমুনেও নাকি গিয়েছিল । তারপর আবিদ নিজেও বিয়ে করে । জীবন তো আর থেমে থাকেনা । এক বছর ইরার সাথে সংসারের পর জারিফ । আজ সে যখন সব ভুলে পুরোদস্তুর সংসারী, তখন হঠাৎ কেন এই ঝড় ? তীব্র পিপাসায় মরুর বুকে যখন সে চাতকের মত ছটফট করছে , তখন তো কেউ আসেনি ? তবে আজ কেন এসেছে ? আজ কি তার মৃত মায়ের আত্মা নির্বাণ লাভ করে ফেলেছে ? নইলে প্রেমের জোয়ার ভাসিয়ে কেন বেহায়ার মত জাকির আমন্ত্রণ পাঠায়---- "চলোনা , বছরখানেকের জন্য হাওয়াই দ্বীপে যাই । হানিমুন করতে । বছরের ৩৫০ দিনের বৃষ্টিও একঘেয়ে লাগবে না । তুমি আমি পাশে থাকলে... যাবে ? "
চায়ে চুমুক দিতে দিতে আবিদ বাস্তবে ফিরে আসে , মাথা নাড়ে ---- না , যাবো না , যাবোনা । কেন যাবে সে ? তার যাওয়ার প্রশ্নই আসেনা । তবু... তবু কেন মনের একটা অংশ বারবার প্ররোচিত করছে তার কাছে যেতে ? খুব রোমান্টিক ছিল জাকির , সেজন্য ? গেলে নিশ্চয়ই রোমান্টিকতার নিত্য নতুন উপায় বের করে আবিদের দুনিয়াটাই বদলে দিবে । নাকি শরীর নতুনকরে জেগে উঠেছে ? সেই গোপন কাম- সেক্সুয়াল আকর্ষণ যা সে সবসময় ভুলতে চেয়েছে , সেই সেক্সুয়ালিটি আজ দরজায় কড়া নেড়ে আবার জেগে উঠছে । কেন আবিদ যেতেই চাইছে ? একা একা আপনমনে আবারো মাথা নাড়ে । না যাবোনা । যাবো কেন ? যাবোনা । ইরা এরই মধ্যে ক্যাসেট প্লেয়ারে গান ছেড়ে দিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে । তার হাতেও কাপ । সেই কবে আবিদ বলেছিল সাউন্ডবক্সে গান শুনতে তার ঠিক ভালোলাগেনা । তারপর ইরা গভীর রাতে চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে এলে চুপচাপ বসে বসে ক্যাসেটে সবগুলো গান রেকর্ড করেছে । আজকাল সেইসব শুনলে মনে হয় , বহু বছরের পুরনো কোন গ্রামোফোন থেকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে গান আসছে । জীবনটাকে কখনও কখনও খুব সুন্দর মনে হয় আবিদের । জয়তী চক্রবর্তীর গলা যখন ভেঙ্গে ভেঙ্গে বলে ---- মেঘের 'পরে মেঘ জমেছে... আঁধার করে আসে.... তখন সত্যিই মনে হয় , জীবন সুন্দর । বেঁচে থাকাটা মন্দ না । কিন্তু মনের মধ্যেও যখন মেঘ জমে থাকে , তখন বেঁচে থাকা দুর্বিষহ । বিভীষিকা । 'ইরা ! ইরা , ধরো আজকে রাত্রে আমি মরে গেলাম । কিংবা ধরো হারিয়ে গেলাম । জারিফকে নিয়ে তুমি চলতে পারবে না ? ব্যাংকের অর্ধেক টাকা তোমার নামে দেওয়া আছে ।" ইরা সামনে থেকে এগিয়ে আসে, তাকে ঝাঁকিয়ে দিতে দিতে বললো, "এই কি হয়েছে তোমার ? কি হয়েছে ? "
***
শীতবৃষ্টির এমন রাতে জম্পেশ একটা ঘুম দেওয়া যেতো , নবদম্পতি হলে জড়িয়ে ধরে উষ্ণতা বাড়ানো যেত , কিন্তু নাইট শিফটের এডিটোরিয়াল সাংবাদিক হলে ঝড় বৃষ্টিতেও বাইরে যেতেই হয় । রেইনকোট গায়ে জড়িয়ে বারবার আয়নায় নিজেকে দেখছিল । রাধা অভিসারে যাওয়ার আগে কি এমন আয়না দেখার সুযোগ পেত ? অজানা একটা অপরাধবোধ আবিদকে ক্ষণে ক্ষণে গ্রাস করছে । জারিফের ঘুমন্ত মুখের দিকে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে রইলো । দেখলো । ভাবলো । কেমন হবে যদি আজ রাতে সে অন্ধকারে মিশে যায় ? আর কখনো ফিরে না আসে ? ইরা নিশ্চিত হাল ধরবে সংসারের --- বেশ শক্তভাবে । বেশ শক্তশাক্ত মেয়েটা একদিন বুড়িয়ে যাবে , কিন্তু জারিফকে সে ঠিক ঠিক দাঁড় করিয়ে ফেলবে । আবিদও হয়তো এখানে ওখানে করে জীবন কাটিয়ে দিবে , অথবা জাকিরকে নিয়ে উড়ে যাবে সীমানা পেরিয়ে । বৃষ্টির রাতে পুরনো সেই রোমান্স কেমন হতে পারে ? জাকির নির্লজ্জের মত জানিয়ে দিয়ে তাকে লোভী বানাতে চেয়েছিল --- সেই পুরনো ঠিকানাতেই নতুন আস্তানা গড়েছি । সেই পুকুরপাড় , সেই অশোক গাছ । তুমি এসো । বৃষ্টির রাতে ছাতার মধ্যে লাইট লাগিয়ে আমরা পুকুরে জড়াজড়ি করে বৃষ্টি শুনবো । এসো , আমার ঘরে এসো । সবকিছুই হয়তো হতে পারে আবিদের অন্ধকারে মিশে যাওয়ার পর । আর কখনো পিছনে তাকাবে না সে । গৌতমের মত সোজা চলে যাবে সেই পুরান আস্তানায় । চাইলে সে দুই নৌকাতেই পা রাখতে পারে । দুদিকেই প্রেমিক সেজে চলতে পারাটা খুব সহজ নয় সত্যি , তবে সে হয়তো পারতো । কিন্তু এদিকের পাল্লায় এমন একজন আছে , যার সাথে ঠিক অভিনয় করে চলা সাজেনা । প্রেমিক হিসেবে দুই ভাগ হলেও বাবা হিসেবে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া তার জন্য অসম্ভব । ওখানে জারিফের মতন কেউ থাকবেনা নিশ্চিত , কিন্তু যেটুকু সময় সে জাকিরকে দিবে , সেই অনেকটা সময়েও জারিফের ভাগ আছে । যেতে যদি হয় , তবে সব ছেড়ে মায়া ত্যাগ করেই যেতে হবে । তারপর... তারপর... হয়তো পুরাতন দিনের সবগুলো স্বপ্নই পূর্ণ হবে !
শুধু জারিফের "বেইবি" ডাকটুকু হয়তো আর শোনা হবে না , ঘুমানোর সময় কেউ ছোট দুটো পা তুলে লাথি দিবেনা , ঘুমের মাঝে কেউ গলায় খামচি দিয়ে ধরবে না , কাউকে সে শুধু জিজ্ঞেস করতে পারবেনা , 'ওই পুলা , বলতো , পুলা মানে কী ? ' , 'মাছ বৃষ্টির গল্প শুনবি? সাধু ম্যানুয়েল কিভাবে মাছের বৃষ্টি নিয়ে এসেছিল ? ' ইরার অভিমানও আর কখনো দেখবে না , রেকর্ড প্লেয়ারে গান শুনতে শুনতে কখনো উপভোগ করতে পারবেনা --- জীবন হয় সৌন্দর্য ! আবিদ কোন কথা না বলে রেইনকোট খুলে ফেললো । ইরা জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকে ।
'আজ আমি কোথাও যাবোনা ! ' বলে আবিদ বিছানায় শুয়ে পড়ে , তার বুকের উপর জারিফের মাথা ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন